ছোট্ট দীপাঞ্জনাকে অদিতি এবং নিজের জামাকাপড় ব্যাগে গোছাতে দেখে জিজ্ঞেস করল শুভদীপ। দীপাঞ্জনা তার বাবার কথার কোনো প্রত্যুত্তর না দিয়ে বাবা এবং মায়ের জামাকাপড় গুছিয়ে রাখতে লাগল ব্যাগে। মেয়ের এরকম অস্বাভাবিক আচরণ দেখে অবাক হল শুভদীপ। কৌতুহল নিয়ে রান্নাঘরে থাকা অদিতির কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল
– অদিতি তুমি কি দীপকে কোথাও নিয়ে যাবে বলেছ? আমাদের কি কোনো সারপ্রাইজ ট্যুর আছে?
অদিতি শুভদীপের কথা শুনে অবাক হয়ে বলল,
– মানে?কিসের সারপ্রাইজ ট্যুর? আমি তো অফিস থেকে ছুটিই পাব না৷
– তাহলে দীপ যে জামাকাপড় গোছাচ্ছে তোমার আর আমার।
অদিতি অবাক হয়ে বলল,
– সকাল থেকেই গোছাচ্ছে। আমি জিজ্ঞেস করলাম কোনো উত্তির দিল না৷ আমি ভাবলাম তুমি হয়ত কোনো ট্যুর অ্যারেঞ্জ করেছ৷
– সে নয় ওর ইচ্ছে হলে একদিন কোথাও ঘুরিয়ে নিয়ে আসা যাবে। কিন্তু অদিতি ও তো নিজের জামাকাপড় প্যাক করছে না।
অদিতি শুভদীপের দিকে তাকিয়ে বলল,
– আজকে খাওয়ার সময় জিজ্ঞেস করব ও কোথায় ঘুরতে যাবে। বুঝলে। ওর মনে হয় বেড়াতে যেতে ইচ্ছে করছে কোথাও।
শুভদীপ অদিতির কথা শুনে হেসে বলল,
– তোমার মেয়ে তোমার মতই৷ উফ ইচ্ছে হলে সরাসরি বলে না।
অদিতিও হাসল শুভদীপের কথা শুনে। আজকে মানুর মা আসে নি। রাতের রান্নাটা তাকেই করতে হচ্ছে তার জন্যে। শুভদীপ সাহায্য করে দিয়ে গিয়েছে৷ কিন্তু সেটাও সামান্য৷ শুভদীপ কোনোকালেই ঘরের কাজ করতে ভালোবাসে না। অদিতির শাশুড়ি মিতাদেবী অনেক সাহায্য করতেন অদিতিকে। কিন্তু তিনিও মাস খানেক হল বৃদ্ধাশ্রমে। মিতাদেবী বৃদ্ধাশ্রমে যাওয়ার পর থেকেই মন ভালো থাকে না অদিতির। অফিস থেকে ফিরে সেই যত্নটা পায় না। মা মরা অদিতির জীবনে যে মিতাদেবীই মায়ের জায়গা পূরণ করেছিলেন। বিয়ে হয়ে আসার পর থেকে মিতাদেবী কোনোদিন তাকে মায়ের অভাব বুঝতে দেন নি। মা মরা মেয়েটিকে বুকে টেনে নিয়েছিলেন পরম যত্নে। অদিতির আজও মনে পরে দীপাঞ্জনা হওয়ার একবছর পরে সে যখন আবার অফিস যাওয়া শুরু করার দিন গুলোর কথা।
বাড়ি ফেরার পর প্রায় দিনই ক্লান্ত থাকত অদিতি। মিতাদেবীই খাইয়ে দিত তাকে মাঝে মাঝে। মিতাদেবীকে তাই অদিতি কোনোদিন দেখে নি শাশুড়ি হিসেবে। মা ভেবেছিল সবসময়। তাই নিজের শাশুড়ি রূপী মায়ের একাকীত্ব দূর করার জন্যে একটা স্মার্টফোন কিনে দিয়েছিল। শিখিয়ে দিয়েছিল ভিডিও কল করা। অফিসে থাকলে মাঝে প্রায়ই ভিডিও কল করতেন তিনি। অনেক সময় জরুরি মিটিং র মধ্যে থাকলে কল ধরতে না পারলে পরে কল করে নিত। মিতাদেবীর সেই আনন্দিত দৃষ্টি দেখে অন্তর জুড়িয়ে যেত অদিতির। মিতাদেবী মাঝে মাঝে ভিডিও কল করত নিজের ছেলেকেও। শুভদীপ বিরক্ত বোধ করত প্রতি মুহুর্ত৷ অদিতির আজও মনে সেই দিনটার কথা। মিতাদেবী সেদিন খুব খুশি হয়ে শুভদীপকে ভিডিও কল করেছিল। প্রথম বার না ধরার কয়েকবার করে আরো। শুভদীপ বাড়ি ফিরে যারপরনাই অপমান করেছিল নিজের মাকে। বৃদ্ধা মামুষটার চোখ বেয়ে কেবল অঝোরে জল ঝড়ে ছিল। অদিতিকে জড়িয়ে খুব কেঁদে ছিলেন তিনি। তার দুঃখে মন ভারাক্রান্ত হয়েছিল অদিতিরও৷ অদিতি এই ব্যপারটি নিয়ে অশান্তিও করেছিল শুভদীপের সাথে। অদিতি তো কোনোদিন শুধুমাত্র শুভদীপের স্ত্রী হতে চায় নি। সে তো মিতাদেবীর মেয়েও হতে চেয়েছিল৷ কিন্তু শুভদীপ সেটা হতে দেয় নি তাকে। শুভদীপের সাথে প্রেমের সম্পর্কে থাকাকালীনই মিতাদেবীকে মা ভাবত সে। তার ব্যবহারে মুগ্ধ হয়েই মিতাদেবী ভালোবাসতে শুরু করেছিল তাকে।
কিন্তু অদিতি ইদানীং লক্ষ্য করছিল শুভদীপ তার মা মিতাদেবীকে লোকের সামনে নিয়ে যেতে লজ্জা পেতে শুরু করেছে৷ অদিতির আজও সেই রাতটার কথা মনে পরলে চোখ জলে ভরে যায়। সেই দিন শুভদীপ তার কিছু অফিস কলিগদের বাড়িতে নিয়ে এসেছিল গেট টুগেদারের জন্যে। মিতাদেবীকে তার আগেই শুভদীপ না করেছিল তাদের সামনে আসতে। মিতাদেবীর খেয়াল ছিল না সে কথা। চশমার হাতল ভেঙ্গে যাওয়াত চশমাটি হাতে নিয়ে পৌছে ছিল শুভদীপের সামনে। শুভদীপ তাতেই বেজায় চটে গিয়েছিল নিজের মায়ের ওপরে৷ তার মনে হয়েছিল ক্লাইন্টের সামনে তার মা ভাঙ্গা চশমা নিয়ে উপস্থিত হওয়ায় তার ইমেজ নষ্ট হয়েছে। সে তাই সেদিন তার মাকে হাত ধরে টানতে টানতে ওপরে নিয়ে গিয়ে ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে দিল। অদিতি দরজা খুলে ঘরে গিয়ে শুভদীপের জন্যে দ্বিতীয়বার কাঁদতে দেখেছিল মিতাদেবীকে। অদিতিকে জড়য়ে ধরে তিনি যেন আশ্রয় খুঁজছিলেন বার্ধক্যের৷ অদিতি তাকে জড়িয়ে তার কান্না থামিয়েছিল সেদিন। অদিতির আশ্বাসেই সেদিন কান্না থামিয়ে নিজেকে সামলেছিলেন মিতাদেবী। কিন্তু তাও শেষরক্ষা হল না। এই ঘটনার কিছুদিন পরেই একদিন অদিতি এবং শুভদীপ জানতে পারল তারা দ্বিতীয়বারের জন্যে বাবা মা হতে চলেছে। খুশির আবহাওয়ায় মেতে উঠেছিল বাড়ি। এই খুশি যে ক্ষণস্থায়ী ছিল জানতেন না তারা। রোজকার মতই সেদিনও মিতাদেবী ঠাকুর ঘরে ঢুকেছিলেন পূজো করতে। কিন্তু বার্ধক্যজনিত কারণেই ভুলোমনা হয়ে পরেছেন তিনি। ফলে ফুল ছাড়াই পূজো করতে বসে পরেন। হাতের কাছে ফুল না পেয়ে অদিতিকে ডেকে বলেছিলেন,
“দিতি ফুলটা একটু দিয়ে যাবি মা?”
মিতাদেবীর ডাক শুনে তাড়াহুড়ো করে ফুলের প্যাকেট হাতে ঠাকুর ঘরে ঢোকার সময় মার্বেলে পা স্লিপ করে মেঝেতে পরে যায় সে। পেটে আঘাত লেগে বাচ্চা পেটেই মারা যায়। যন্ত্রণায় ছটফট করতে থাকে সে৷ মিতাদেবী পুজো ফেলে চিৎকার করতে থাকে ম শুভদীপ অদিতিকে গাড়িতে তুলে তাড়াহুড়ো করে পৌছায় হাসপাতালে। সেখানে গিয়েই জানতে পারে মিসক্যারেজের কথা। মায়ের ওপর রাগ যেন শতগুণে বেড়ে যায় শুভদীপের। অদিতিকে বাড়ি ফিরিয়ে আনার পর কিছুটা সুস্থ হলেই মিতাদেবীকে শুভদীপ রেখে আসে বৃদ্ধাশ্রমে। অদিতিকে জড়িয়ে সেদিনও খুব কেঁদেছিলেন তিনি। অদিতিও যে চায় নি মিতাদেবীকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাতে। মিতাদেবীর চলে যাওয়ার পর অদিতি প্রায় সাতদিন ভালো করে খাইয়া দাওয়া করে নি। নিজের মাকে দূরে পাঠিয়ে কোন মেয়েই মা ভালো থাকে, অদিতিও তাই ভালো ছিল না। কিন্তু শুভদীপের তা আদিখ্যেতা ছাড়া কিছুই মনে হয় না। কটাক্ষ করে বলেছিল তাই,
“কর্পোরেট সেক্টরে কাজ করা মেয়েরা আবার এত ইমোশনাল হয় নাকি? যত ঢং। ”
অদিতি তাই নিজের কষ্টগুলো লুকিয়ে রেখেছিল নিজে। মিতাদেবীকে অদিতির অজুহাতে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠালেও অদিতির প্রতি যথেষ্ট যত্নবান কোনো কালেই ছিল না শুভদীপ। অদিতির মিসক্যারেজ হওয়ার পরেও তাই শারীরিক অসুস্থতা নিয়েই ঘরের অনেক কাজ করতে হত তাকে। কারণ শুভদীপ মনে করে গৃহস্থালির কাজ করলে পুরুষত্বে আঘাত লাগবে শুভদীপের।
পুরোনো কথাগুলো মনে করে একরাশ বিরক্তি এবং কষ্ট নিয়েই তাই কাজ করছে অদিতি। রাতের খাওয়ার তৈরী শেষ৷ ডিনার টেবিলে খাবার সার্ভ করে সে দীপাঞ্জনা এবং শুভদীপকে ডাকল ডিনারে। দীপাঞ্জনা একা খেতে পারে না। অদিতিকেই খাইয়ে দিতে হয় তাকে। খাবার টেবিলে বসে তাই দীপাঞ্জনাকে খাইয়ে দিতে দিতে অদিতি তার মাথায় হাত বুলিয়ে জিজ্ঞেস করল,
– বাবি তুমি আমার আর বাপির জামাকাপড় ব্যাগে গোছাচ্ছিলে কেন?
দীপাঞ্জনা হাসিমুখে উত্তর দিল,
– কেন মামমাম মা বাবাকে তো ওল্ডেজ হোমে রেখে আসতে হয়৷ বাপিও তো ঠাম্মিকে রেখে এসেছে৷ আমি তাই তোমাদের ওখানে রাখতে যাব৷ তোমরাও তো বুড়ো হচ্ছ। বাপি কাল তার অনীশ আঙ্কেলকে বলছিল বাপি বুড়ো হচ্ছে বয়স বাড়ছে। তাই তো তোমাদের ওল্ডেজ হোমে রাখতে যাব৷ নাহলে আমার প্রাইভেসি নষ্ট হবে, ইমেজ নষ্ট হবে। তুমি আর বাপি যদি ভাঙ্গা চশমা নিয়ে আমার বন্ধুদের সামনে গিয়ে দাড়াও? তাহলে?
মেয়ের কথা শুনে অদিতি মুখে এক প্রশান্তি নিয়ে তাকাল শুভদীপের দিকে। শুভদীপের চোখে তখন ফুটে উঠেছে অপরাধ বোধ। অদিতি হেসে দীপাঞ্জনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল,
– হ্যা সোনা মা বাবাকে বৃদ্ধাশ্রমেই রেখে আসতে হয়৷ তোমার কি দোষ তুমি যা দেখবে তাই তো শিখবে৷
নিজের মায়ের প্রতি তার ব্যবহার তার সন্তানকে যে এভাবে প্রতিফলিত করবে স্বপ্নেও তা ভাবে নি শুভদীপ। তার সন্তান যে তার সব কার্যকলাপ এত সুন্দর ভাবে লক্ষ্য করেছিল বুঝতে পারে নি সে। চুপচাপ রাতের খাওয়া শেষ করে ঘুমোতে গেল তারা। অদিতিকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পরল দীপাঞ্জনা। শুভদীপ তখনও জেগে। তার স্মৃতিপটে ভেসে আসতে লাগল বিভিন্ন স্মৃতি। মনে পরতে লাগল কিভাবে তার বাবার প্রয়াণের পর মিতাদেবী একা তাকে মানুষ করেছেন। তাকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। মনে পরতে লাগল সেই ছোটবেলার কথা। টাইফয়েড হয়েছিল তার। প্রবল জ্বর উঠেছিল। মিতাদেবী সারারাত মাথায় পাশে জেগে বসেছিলেন। আর ঠিক তার পাশাপাশি মনে পরল তার মায়ের প্রতি তার ব্যবহার। সময়ের সাথে সাথে বৃদ্ধা মায়ের প্রতি কি ভীষণ বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছে সে। সারা রাত তার আর ঘুম হল না।
আজকের সকালটা অন্যদিনের মত নয় একেবারেই। অদিতি দীপাঞ্জনা ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেল শুভদীপ নেই বিছানায়। বিছানা ছেড়ে দীপাঞ্জনাকে ঘুম থেকে তুলে ব্রাশ করিয়ে নিচে নেমে এল সে। নিচে নামতেই খুশিতে চোখ জলে ভরে এল তার। মিতাদেবী বসে আছেন সোফাতে। আর তার কোলে মাথা দিয়ে শুয়ে আছে শুভদীপ। মানুর মা আজ তাড়াতাড়ি কাজে এসেছে। মিতাদেবীকে দেখে মানুর মার বলল,
“জেঠাইমা তুমি ছিলে না ঘরখান ফাকা ফাকা লাগতাসিল। ”
মিতাদেবীকে সোফায় বসে থাকতে দেখে দৌড়ে নিচে নেমে এসে মিতাদেবীকে জড়িয়ে ধরল অদিতি। ঠাম্মাকে বাড়িতে দেখে খুশি দীপাঞ্জনাও। শুভদীপ তার মায়ের দিকে তাকিয়ে তার মায়ের কাছে ক্ষমা চাইল মনে কয়েক সহস্রবার। অদিতি মিতাদেবীর হাতে তুলে দিল ঘরের চাবি। প্রথমে তিনি নিতে অস্বীকার করছিলেন, কিন্তু অদিতি অশ্রুসজল চোখে জোর করে তার হাতে দিয়ে বলল,
“মা এ ঘর সংসার তোমার। তোমার কাছ থেকে টাকা চেয়ে নেওয়াতেই আমাদের শান্তি। ”
মিতাদেবী আশীর্বাদের হাত সস্নেহে বুলিয়ে দিলেন তার মাথায়। শুভদীপ অদিতির হাত ধরে অদিতির দিকে তাকিয়ে বলল,
“জানো অদিতি বুঝতে বড্ড দেরী হয়ে গেল। মা ছাড়া বাড়ি সম্পূর্ণ হয় না কখনো। আরেকটু দেরী হলে হয়ত আমাদেরও ঠাঁই বৃদ্ধাশ্রমেই হত। আসলে আমি ভুলে গিয়েছিলাম আমাদের সন্তান যে আমাদেরই প্রতিবিম্ব। যা দেখবে তাই শিখবে। ভাগ্যিস ভুলটা ধরিয়ে দিয়েছিল৷ আমার মেয়েই যে আমার প্রকৃত শিক্ষক৷ ”
সস্নেহে দীপাঞ্জনাকে কোলে তুলে নিল শুভদীপ। শুভদীপের মুখে ইতিমধ্যেই সব কথা শুনেছিলেন মিতাদেবী। তার একমাত্র নাতনিকে আদর করে অশ্রুসজল চোখে আশীর্বাদ করে মনে মনে বললেন,
“ভাগ্যিস তুই ছিলিস দিদিভাই। নাহলে হয়ত শেষ জীবনটা বৃদ্ধাশ্রমেই কাটাতে হত। আমার শেষ ঠিকানাও হয়ত বৃদ্ধাশ্রমই হত। শুধু তোর জন্যেই আমার ঠিকানা নয় বৃদ্ধাশ্রম। “
লেখিকা – স্বাতী লগ্না বোল
এরাম আরও গল্পের জন্য এই apps টি Install করুন –> https://play.google.com/store/apps/details?id=com.banglastory.igyantech&hl=en

