
শিয়ালের নাকে কাঁটা ফোটার সেই গল্পটা মনে আছে? খিদের জ্বালায় শিয়াল বেগুন খেতে গেল। তারপর বেগুন খাওয়ার সময় তার নাকে কাঁটা ফুটল। যন্ত্রণায় কাতর শিয়াল অনেক চেষ্টা করেও নাকের কাঁটা বের করতে না পেরে ছুটল নাপিতের বাড়ি। শিয়ালের কষ্ট দেখে নাপিত কাঁটা বের করতে গিয়ে তার নাক কেটে ফেলল। তা দেখে খেপে আগুন শিয়াল বলল, এখনই আমার নাক ঠিক করে দাও, না হলে লণ্ডভণ্ড করে দেব। নাপিত কাকুতি মিনতি করে বলল, শিয়াল ভায়া, আমায় মাফ করে দাও। শিয়াল বলল, মাফ করতে পারি, যদি তোমার নরুনটা আমায় দাও। নাপিত নরুনটা শিয়ালকে দিয়ে কোনও রকমে রক্ষা পেল। শিয়াল খুশিতে গান ধরল, ‘তাক ধুমা ধুম ধুম/ বেগুন খেতে ফুটল কাঁটা যম/ তাক ধুমা ধুম ধুম/ কাঁটা তুলতে কাটল নাক ব্যথা নয় তার কম/ তাক ধুমা ধুম ধুম/ নাকের বদলে নরুন পেলাম/ তাক ধুমা ধুম ধুম/’। রাজ্য সরকারের ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্পের বদলে এরাজ্যে ‘প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি যোজনা’ নিয়ে বিজেপি নেতাদের উচ্চকিত কথাবার্তায় নাকের বদলে নরুন পাওয়ার গল্পটা বারবার মনে পড়ে যাচ্ছে।
লোকসভায় ধ্বনিভোটে তিনটি কৃষি বিল পাশ করিয়ে নেওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে কৃষক আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছে। দেশের সমস্ত রাজ্যে কৃষি আইনের বিরুদ্ধে চাষিরা আন্দোলন করলেও হরিয়ানা এবং পাঞ্জাবের লড়াই দেশবাসীর নজর কেড়েছে। প্রচণ্ড শীতেও তাঁরা দিল্লির উপকণ্ঠে রাস্তায় বসে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের একটাই দাবি, কৃষকের স্বার্থের পরিপন্থী এই কালাকানুন বাতিল করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের দেওয়া একের পর এক প্রস্তাব তাঁরা খারিজ করে দিচ্ছেন। বিপাকে পড়ে আন্দোলন ভাঙার বহু চেষ্টা করেও সাফল্য পায়নি মোদিজির সরকার। এমনই এক পরিস্থিতির মুখে দাঁড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতৃত্ব কাচের ঘরে বসে ঢিল ছুঁড়ছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের গায়ে ‘কৃষক বিরোধী’ তকমা সেঁটে দেওয়ার মরিয়া চেষ্টা চালাচ্ছে।
বিজেপির মণ্ডল সভাপতি থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ, এমনকী প্রধানমন্ত্রী বলছেন, এরাজ্যের চাষিদের কেন্দ্রীয় আর্থিক সুবিধা থেকে মমতার সরকার বঞ্চিত করছেন। প্রত্যেক চাষিকে বছরে ৬ হাজার টাকা দিতে চাইছে কেন্দ্র। অন্য রাজ্যের চাষিরা সেই সুযোগ পেলেও পশ্চিমবঙ্গ বঞ্চিত হচ্ছে। কারণ তৃণমূল সরকার এরাজ্যে কেন্দ্রের প্রকল্প চালু করতে চাইছে না। রাজ্যে বিজেপি সরকার এলে এরাজ্যের চাষিদের অ্যাকাউন্টে সেই টাকা ঢুকতে শুরু করবে। তাই যেভাবেই হোক ২০২১ সালে বঙ্গে পদ্ম ফোটাতে হবে।
মোদির কিষান সম্মান নিধি প্রকল্প
এবার দেখা যাক, কেন্দ্রীয় সরকার চাষিদের জন্য যে ‘প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধি যোজনা’ এনেছে, তাতে কী আছে? এই প্রকল্পে কারা সুবিধা পাবেন এবং কীভাবে সুবিধা পাওয়া যাবে তার একটি গাইড লাইন কেন্দ্রীয় সরকার তৈরি করেছে। সেখানে কারা চাষি পরিবার ও প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা হয়েছে। নির্দেশিকার ৪ নম্বর পয়েন্টে কোন চাষিরা এই প্রকল্পের সুবিধা পাবেন না, তার উল্লেখ আছে। কী রয়েছে সেখানে?
নির্দেশিকায় পরিষ্কার করে বলা আছে, চতুর্থ শ্রেণীর কর্মী বাদে কেন্দ্রীয় সরকারের বা রাজ্য সরকারে কর্মরত এবং অবসরপ্রাপ্ত কোনও কর্মী এই প্রকল্পে টাকা পাবেন না। এমনকী, মাসে ন্যূনতম ১০ হাজার টাকা পেনশন পান, এমন কোনও ব্যক্তি এই সুযোগ পাওয়ার যোগ্য নন। এছাড়া যাঁরা আয়কর দেন, তাঁদের জমি থাকলেও প্রধানমন্ত্রী কিষান সম্মান নিধির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।
বাতিলের তালিকা এখানেই শেষ নয়। সেই তালিকায় ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারের পাশাপাশি আইনজীবীদেরও যুক্ত করা হয়েছে। (Professionals like Doctors, Engineers, Lawyers, Chartered Accountants and Architects registered with professionals bodies and carrying out profession by undertaking practices) ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি করে বা আইনজীবী ওকালতি করে কত আয় করছেন, সেটা দেখা হবে না। এই পেশায় যাঁরাই যুক্ত থাকবেন তাঁরা কেন্দ্রীয় সরকারের অনুদান থেকে বঞ্চিত হবেন। এছাড়াও সংসদীয় কোনও পদে কখনও যুক্ত থেকেছেন এমন ব্যক্তির পরিবারও বাদ যাবেন।
তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে, কেন্দ্রীয় সরকারের ‘কিষান সম্মান নিধি’র প্রাপক হবেন কারা? এরাজ্যে সেই সংখ্যাটা কত হবে? আসল খেলাটা এখানেই। এই অঙ্কের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘কৃষক দরদি’র আসল চেহারাটা!
ডাক্তারি বা আইআইটির অ্যাডমিশন টেস্ট বা চাকরির পরীক্ষার প্রশ্ন করার সময় পেপার সেটাররা অনেকসময় পরীক্ষার্থীকে ‘মিসগাইড’ করার দিকে বেশি নজর দেন। কারণ প্রতিটি ক্ষেত্রে আবেদনকারীর তুলনায় আসন সংখ্যা অত্যন্ত কম থাকে। তাই তাঁরা সবসময় এমন প্রশ্ন করেন, যাতে অধিকাংশ ছাত্রছাত্রীই বিভ্রান্ত হয়ে ভুল উত্তর দেয়। সেই জন্য এই ধরনের পরীক্ষাকে ‘সিলেকশন টেস্ট’ না বলে ‘রিজেকশন টেষ্ট’ অর্থাৎ বাতিল করার পরীক্ষা বলা হয়।
কেন্দ্রীয় সরকারের এই গাইড লাইন দেখে অনেকে বলছেন, এটা কৃষকদের অনুদান দেওয়ার নয়, সাহায্যের তালিকা ছোট করার নির্দেশিকা। এই প্রকল্পে কেন্দ্রীয় সরকার ‘কৃষক দরদি’ সাজার পাশাপাশি যথাসম্ভব কম টাকা খরচের চেষ্টা করেছে। তাই বাতিলের লিস্ট অনেকটাই লম্বা। একে বলে, এক ঢিলে দু’টি পাখি মারা।
কেন্দ্রের নয়া আইনে চাল, ডাল, আলু, ভোজ্য তেল, পেঁয়াজ সহ একগুচ্ছ পণ্য নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের তালিকা থেকে বাদ পড়েছে। কর্পোরেট সংস্থা মজুতদারির অবাধ ছাড়পত্র পেয়েছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম নিম্নবিত্তের ও গরিবের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি ক্ষোভ বাড়ছে চাষিদেরও। তারই মধ্যে এগিয়ে আসছে পশ্চিমবঙ্গের ভোট। তাই জনস্বার্থে একের পর এক কর্মসূচি নেওয়া মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের গায়ে ‘কৃষক বিরোধী’ তকমা লাগিয়ে দিতে মরিয়া বিজেপি। চাষিদের ক্ষোভকে উস্কে দেওয়াই লক্ষ্য। এই প্রকল্পে রাজ্যের খুব অল্প চাষি পরিবার যে উপকৃত হবে, সেটা গোপন রাখা হয়েছে।
কাঁসর ঘণ্টা বাজিয়ে করোনা তাড়ানোয় বিশ্বাসী বিজেপি নেতারা মানুষের মন খুব ভালো বোঝেন। তাঁরা জানেন, যে মাছটা পালিয়ে যায়, সেটাকে সব সময় বড় ভাবতে মানুষ বেশি পছন্দ করে। তাই অনুদান না পাওয়ার বিষয়টিকে বড় করে দেখিয়ে চাষি খেপানোর চেষ্টা চালাচ্ছেন। মণ্ডল সভাপতি থেকে প্রধানমন্ত্রী।
মমতার ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্প
এবার দেখা যাক, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় চাষিদের জন্য কী করেছেন? এখন আর শস্যবিমার জন্য চাষিদের টাকা দিতে হয় না। বিমার প্রিমিয়াম দেয় সরকার। চাষিরা অল্প পয়সায় কৃষিকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম ভাড়া নিতে পারেন। প্রাকৃতিক কারণে ফসল নষ্ট হলে নিয়ম করে ক্ষতিপূরণ পান। আর চাষের জন্য আর্থিক অনুদান?
মমতার সরকার আগেই চালু করেছে ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্প। এক একর জমি থাকলেই রাজ্যের সমস্ত কৃষক পরিবার বছরে ৫ হাজার টাকা অনুদান পাচ্ছে। চাষের খরচ বাবদ এই টাকা দেওয়া হচ্ছে। তাই কম জমির জন্য কম টাকা। কিন্তু, একজন চাষি বছরে ন্যূনতম এক হাজার টাকা পাবেনই। একথা শহরের মানুষ না জানলেও গ্রামে যাঁদের এক ছটাক জমি আছে, তাঁরা বিলক্ষণ জানেন। এটা বিদেশে গচ্ছিত কালাধন এনে প্রত্যেকের আ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দেওয়ার মতো ভাঁওতা নয়। একেবারে বাস্তব।
রাজ্যের ‘কৃষকবন্ধু’ প্রকল্পে আয়ের কোনও ঊর্ধ্বসীমা নেই, পেশার বাছবিচার নেই। নেই কথার মারপ্যাঁচ। কেন্দ্রীয় সরকার যেখানে কৌশলে চাষির সংখ্যা কমাতে চাইছে, মমতার সরকার বেনিফিশিয়ারির সংখ্যা বাড়াতে বদ্ধপরিকর। রাজ্য সরকারের চোখে সকল ছাত্রছাত্রীই যেমন ‘সবুজসাথী’, সকল কন্যাসন্তান যেমন ‘কন্যাশ্রী’, ঠিক তেমনই সকল চাষি সরকারের চোখে ‘কৃষকবন্ধু’। কেবল চাষিরা নয়, ভাগচাষিরাও এখন ‘কৃষকবন্ধু’।
তাই শুধু বিশ্বের সর্ববৃহৎ দল বলে দাবি করা বিজেপি নয়, গোটা বিশ্ব যদি বলে, রাজ্য সরকার চাষিদের বঞ্চিত করছে বা ঠকাচ্ছে, সেটা চাষি কিছুতেই বিশ্বাস করবেন না। উল্টে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘প্রধানমন্ত্রী কৃষক সম্মান নিধি যোজনা’র গোটা বিষয়টি চাষিরা জানলে নাক ও নরুনের তফাৎটা উপলব্ধি করতে পারবেন। তখন তাঁরা বুঝবেন, বিজেপি সুকৌশলে তাঁদের হাতে ‘নাকে’র বদলে ‘নরুন’ ধরিয়ে দিতে চাইছে
